শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কট ও ছাত্র-শিক্ষকদের অপরাজনীতি থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয়

অথর
জে এন এস নিউজ ডেক্স :   কুষ্টিয়া
প্রকাশিত :১ জুন ২০২২, ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 30 বার
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্কট ও ছাত্র-শিক্ষকদের অপরাজনীতি থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয়

আমাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে অবক্ষয়, বৈষম্য ও দুর্নীতি অক্টোপাসের মত রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকে গ্রাস করেছে তার মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট। শিক্ষাকে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে এই সংকটের শুরু। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতের হিন্দু-মুসলমানের স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কেরানী সৃষ্টির উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিকুলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই সংকটের সূচনা করেছিল। কিন্তু বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জাতি মুক্ত হওয়ার সাত দশক পেরিয়ে এসেও আমরা শিক্ষা ও নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে মুক্ত হতে না পারার কারণ হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাষ্ট্রের সীমাহীন ব্যর্থতা। বিশেষত স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক পরিকল্পনা হওয়ার কথা ছিল নতুন রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা, ধর্মীয়- সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যকে ধারণ করার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। বঙ্গবন্ধু সরকার সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাহাত্তুর সালের শুরুতেই দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুতরাত-ই খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়। কুদরাত-ই খুদা কমিশন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও কর্মমূখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উপযোগী একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে পেশ করলেও সেটি একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, অন্যদিকে এই শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিক প্রয়াস এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। হীন দলীয় স্বার্থের রাজনৈতিক কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সন্ত্রাসও অবক্ষয়ের শিকারে পরিনত করা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার করুণ ইতিহাস বহন করছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। গত ৫০ বছরেও আমাদের সরকার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে না পারার খেসারত দিচ্ছে জাতি।

বাহাত্তুর সাল থেকে বর্তমান সরকার পর্যন্ত প্রতিটি সরকারই এক বা একাধিক শিক্ষাকমিশন বা পাঠ্যক্রম নির্ধারণ কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের প্রয়োজনে সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নে তাদের প্রয়াস দেখিয়েছে। তবে কোনো সরকারের কোনো কমিশনই সফল হয়নি। অতীতের চারদশকের ব্যর্থতার অভীজ্ঞতার নিরীখে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে একদশক সামনে রেখে ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার রূপকল্প ২০২১ এর আলোকে নতুন একটি শিক্ষানীতি প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। প্রবীণ ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ প্রফেসর কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিশনের প্রণীত নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে দেশের কোনো রাজনৈতিক পক্ষের আপত্তি বা ভিন্নমত দেখা যায়নি। শিক্ষানীতির মত একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এই নিরবতা ছিল মূলত দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রতিফলন। উল্লেখ্য প্রফেসর কবির চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত কুদরাত-ই-খুদা কমিশনেরও সদস্য ছিলেন। সুতরাং প্রবীন বয়েসে আর নেতৃত্বে গঠিত নতুন শিক্ষাকমিশন রিপোর্টে অতীতের ব্যর্থতার আলোকে নতুন দিক নির্দেশনা ও বাস্তবানুগ প্রকল্প থাকাই ছিল স্বাভাবিক। শেষ শিক্ষানীতিতেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্পৃক্তি না থাকা এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা , নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্নীতিমুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর দিক নির্দেশনা ও শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও অবকাঠামোগত সংস্কারে সরকারের প্রয়োজনীয় বাজেট ও কার্যকর অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ না থাকায় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছর পেরিয়ে এসেও আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্খিত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিনা। সরকার নতুন শিক্ষানীতি গ্রহণ ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণের শুরুতেই অধ্যাপক কবির চৌধুরীসহ দেশের ৫জন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও অ্যাকাডেমিসিয়ান এ বিষয়ে সরকারের কাছে ৯ দফার একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। সেই পাঁচজনের তালিকায় ছিলেন, অধ্যাপক কবির চৌধুরী, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। গত ১২ বছরে এই ৫ জনের মধ্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি ছাড়া বাকি চারজনই মৃত্যুবরণ করেছেন। বিশেষত শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য দূর করাকেই সেই প্রস্তাবের প্রধান প্রস্তাবনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। যৌথ বিবৃতি হিসেবে লেখা বুদ্ধিজীবীদের ৯ দফা সুপারিশের শুরুতে বলা হয়েছে, ’শিক্ষাঙ্গণে অপরাজনীতি দূর হোক, পর্যাপ্ত অর্থায়নসহ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের সুনির্দ্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হোক। মহাজোট সরকারের ২০২১ রূপকল্পে বর্ণিত শিক্ষা ও মানব উন্নয়নের লক্ষ্য আমরা সমর্থন করি। আমরা চাই বিপুল জনসমর্থনে নির্বাচিত এই সরকারের প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক সমাজ গঠন, সবার জন্য মান ও সমতার ভিত্তিতে শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মানের অঙ্গীকার সফল হোক’।

প্রগতিশীল ও তখনকার মহাজোট সরকারের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই ৫ শিক্ষাবিদের ৯ দফা প্রস্তাবের প্রথম দফায় বলা হয়েছে, ‘ছাত্র ও তরুণ সমাজকে অপরাজনীতি থেকে দূরে রাখা ও শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার জন্য ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামীলীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে শিক্ষাঙ্গণে ছাত্র-অছাত্র সবার অপরাধমূলক ও নিয়ম বহির্ভুত কার্যকলাপ কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দেওয়া হোক এবং এ ব্যাপারে সরকারের সর্বস্তর থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হোক। ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্যও এ সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।’ শিক্ষার উন্নয়নে প্রথম থেকে নবম দফায় বিধৃত প্রতিটি প্রস্তাবই সুনির্দ্দিষ্ট ও সুলিখিত। যৌথ বিবৃতিতে সকলের সম অধিকারের ভিত্তিতে প্রগতিশীল ও কর্মমূখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও শিক্ষার সাথে ধর্মীয় নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের ঘাটতি প্রশমনে তেমন কোনো প্রস্তাবনা তারা উপস্থাপন করেননি। নতুন শিক্ষানীতির প্রতি একটি সাধারণ ঐকমত্য ও সমর্থন থাকা সত্তে¡ও গত ১২ বছরে শিক্ষার মানোন্নয়নে এই শিক্ষানীতির কোনো কার্যকর ভ’মিকা দেখা যায়নি। সেই ৫ শিক্ষাবিদের মধ্যে জীবিত একমাত্র ব্যক্তি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি সম্প্রতি একটি পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ সেই নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন যে হলোনা, তার বড় কারণ হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাকে আসলে অতটা গুরুত্বই দেয়া হচ্ছে না। পুরো বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। শিক্ষা এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেছে। এ ছাড়া শিক্ষায় বাণিজ্য এসেছে। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় যে দায়িত্ব, সেটি রাষ্ট্র সেভাবে অনুভব করেনা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-দুই ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি , রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সেভাবে পালন করা হচ্ছে না এবং গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। অথচ এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে যত উন্নয়ন হচ্ছে, তার সবই অর্থহীন হবে যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমরা উন্নয়ন করতে না পারি।’ দেশের শিক্ষাঙ্গণে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠণ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে শুরু করে শিক্ষায় নানাবিধ বৈষম্য, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দলবাজি, দুর্নীতি এবং শিক্ষায় বৈষম্য ও বাণিজ্যিকিকরণের কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই মানহীন ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মানহীনতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আমাদের সমাজে, রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে। আমাদের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিটি নাগরিককে বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মৌলিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রেই আমাদের রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে যেভাবে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয়ে পরিনত করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা খাতকে দুর্নীতি ও লুটপাটের মৌরসি পাট্টায় পরিনত করে চিকিৎসা সেবা খাতকেও গলাকাটা বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিনত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা পায় না। এ সুযোগে রাজধানী শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি শহর-বন্দরে হাজার হাজার ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে সরকারি অনুমোদন ও ন্যুনতম মানদন্ড, নজরদারি ও জবাবদিহিতা ছাড়াই। গত ২৯ মে ঢাকার কয়েকটি স্থানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আকষ্মিক অভিযানে একদিনে ৮৮২টি অনুমোদনহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বন্ধ করে হয়েছে।

গত এক দশক ধরে দেশে একটি উন্নয়নের প্রপাগান্ডা চলছে। কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই উন্নয়নের জিগির তোলা হয়েছে। একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার কারণে জাতি যখন হতভম্ব ও বিক্ষুব্ধ, তখন সরকারের সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষ বলেছিল ‘কম গণতন্ত্র বেশি উন্নয়ন’। গত একযুগে দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটি ক্রমাবনতিশীল হাইব্রিড রিজিমে পরিনত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাওয়ার বাস্তবতার মুখে যখন আমরা উন্নয়নের কথা শুনি, তখন প্রশ্ন ওঠে কিছু রাস্তা, উড়ালসেতু, মেট্টো, পদ্মাসেতু বা বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনই উন্নয়নের শেষ কথা? সম্প্রতি সিরডাপের দেয়া আজিজুল হক পল্লী উন্নয়ন পুরস্কার-২০২১ গ্রহণকালে গণভবন থেকে ভার্চুয়াল বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দেশের সার্বিক উন্নয়ন’ নিশ্চিত করতে সরকারের অগ্রাধিকারের কমিটমেন্টের কথা বলেছেন। কোনো ব্যক্তিকে তিনবেলা পেটপুরে ভুরিভোজ করিয়ে মোটাতাজা করা হলেই যেমন সে মানুষের মত মানুষ হয়েছে বলা যায় না, তেমনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস করে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টর, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার পরও তাকে উন্নয়ন বলা যায়? বিশেষত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গণের বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য এবং উচ্চশিক্ষার কাঙ্খিত পরিবেশ চরমভাবে কলুষিত করার মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সীমাহীন এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অস্ত্রবাজি ও শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ডাকসুর সাবেক ৫ ভিপি এক যৌথ সম্মেলনে ছাত্রলীগের এমন আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এক যুগ আগে সরকারের সমর্থক প্রথিতযশা শিক্ষাবিদরা দেশকে উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে প্রথমেই শিক্ষাঙ্গণকে সন্ত্রাস-নৈরাজ্যমুক্ত করার পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন। শিক্ষাঙ্গণকে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য থেকে মুক্ত করতে প্রথমেই ছাত্রলীগের সাথে শাসকদল আওয়ামীলীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার উপর জোর দিয়েছিলেন। সেই সব প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ- বুদ্ধিজীবীদের এই দাবির আগেই ২০০৯ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের অভিভাবকত্ব বা সাংগঠনিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন বলে তখন খবর বেরিয়েছিল। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করার পাশাপাশি কর্মকান্ড স্থগিত করার আদেশ দেয়া হলেও এমনকি ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও আইনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে কখনো দেখা যায়নি। দেশের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অংশীদার এই সংগঠনটির ভাবমর্যাদা ও ঐতিহ্যকে ধুলায় মিশিয়ে দিলেও এখন আর এ নিয়ে যেন আওয়ামীলীগের কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরপর তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এখন খুবই নড়বড়ে। এহেন বাস্তবতায় দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে আগামী বছরের শেষে একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণে সরকারের কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার মধ্য দিয়ে অপরাজনীতির পুরনো চেহারাটিই আরো প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির অপরাজনীতি, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে না পারলে জাতির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা পুরণ হওয়া সম্ভব নয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকান্ড, বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেত্রিকে পিটিয়ে আহত করা পর্যন্ত গত একযুগ ধরে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড সরকারের অনেক ভাল কাজের অর্জনকে ¤øান করে দিয়েছে। ধারাবাহিক তৃতীয় মেয়াদের শেষ সময়ে এসে সরকার দেশের শিক্ষাঙ্গণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করার মধ্য দিয়ে জনপ্রত্যাশার কিছুটা হলেও পুরণ করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published.