মোবাইল ফোন সেবা নিয়ে বিড়ম্বনা, অভিযোগ এবং গ্রামীণফোনের ব্যাখ্যা

অথর
জে এন এস নিউজ ডেক্স :   কুষ্টিয়া
প্রকাশিত :২৭ মে ২০২১, ৬:৫৬ অপরাহ্ণ | পঠিত : 38 বার
মোবাইল ফোন সেবা নিয়ে বিড়ম্বনা, অভিযোগ এবং গ্রামীণফোনের ব্যাখ্যা

জনপ্রিয় টিভি ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষার অভিযোগ করেছেন গ্রামীণফোন কোনও নিয়ম ছাড়াই তার বাবা-মায়ের মোবাইল থেকে টাকা কেটে নিয়েছে। ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস) সেবার নাম করে কেটে নেওয়া টাকা তার বাবা-মাকে ফিরিয়ে দেয়নি গ্রামীণফোন। প্রায় ৪-৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে তিনি বৃহস্পতিবার (২৭ মে) ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘একটি বিদেশি নম্বর থেকে আমার মা ও বাবা দুজনের কাছেই আলাদাভাবে গভীর রাতে ফোন এসে কেটে যায়। আমার বোন ও ভাই দুজনেই বিদেশে ছিল বলে তারা সর্বদাই উৎকন্ঠিত থাকতেন যদি বিদেশ থেকে ফোন আসে। যেকোনও বিদেশি ফোন দেখলেই কলব্যাক করতেন। তারা সঙ্গে সঙ্গে সেই নম্বরে ফোন করেন ও সেখানে হিন্দিতে নানা রকম কথা শুনতে পান। এরকম দুই তিন দিন হওয়ার পরে তারা আমাকে বিষয়টি জানান। আমি তাদের এরকম ফোন এলে আমাকে জানাতে বলি। এরপর আমি শুনতে পাই যে হিন্দিতে অত্যন্ত কুৎসিৎ আলাপ হচ্ছে এবং এগুলো আগে থেকে কোনও জায়গায় রেকর্ড করে রাখা এবং অটো কোনও সার্ভার থেকে চলছে।

বিল চেক করতে গিয়ে দেখি আমার বাবার পোস্ট পেইড কানেকশনের জামানত থেকে কয়েক হাজার টাকা কেটে নিয়েছে ও মায়েরটা প্রায় শূন্য করে দিয়েছে।

গ্রামীণফোন থেকে আমাকে বলা হয়, এটা ভ্যালূ অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস) বাবদ কেটে নিয়েছে। আমি যেন গ্রামীণফোনের সার্ভিস সেন্টারে যোগাযোগ করি। মিরপুর ১ নম্বরের জিপি সেন্টার থেকে আমাকে বলা হয় এটি একটি আফ্রিকান দেশের ভ্যাস ও টাকাটা সেখান থেকে কাটা হয়েছে। সেই ফোনে নাকি ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস ছিল। এভাবে কি ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসে কাউকে সরাসরি ফোন করলেই দিয়ে দেওয়া যায়?’

ডা. আব্দুন নূর তুষার অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছেন। সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গ্রামীণফোনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোন একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেই ‍বিবৃতিতে গ্রামীণফোন বলেছে, অভিযোগের সপেক্ষে প্রয়োজনীয় ডিটেইলস পাওয়া সাপেক্ষে প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীকে সেবা প্রদানকারী বা অ্যাগ্রিগেটরের রিফান্ড পলিসি অনুযায়ী রিফান্ড প্রদান করতে পারে।

গ্রামীণফোনের বিবৃতির বিষয়টি ডা. আব্দুন নূর তুষারকে জানালে তিনি বলেন, বিষয়টির সমাধান হয়নি। গ্রামীণফোন আমার বাবা-মাকে টাকা ফেরত দেয়নি। কোম্পানি হিসেবে গ্রামীণফোনের এটি দেওয়া উচিত ছিল।

ডা. আব্দুন নূর তুষারের স্ট্যাটাসের আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা গ্রামীণফোন তার ব্যাখ্যায় বলে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী বিটিআরসি ডিরেক্ট অপারেটর বিলিংয়ের জন্য সব মোবাইল অপারেটরকে একটি নির্দেশনা দেয়, যার মাধ্যমে মোবাইল অপারেটর তৃতীয় পক্ষের সীমিত কিছু সেবার ক্ষেত্রে (ডিজিটাল কনটেন্ট ভিত্তিকসেবা, অ্যাপ্লিকেশন স্টোরের অ্যাপ ও সে সংক্রান্ত ইন অ্যাপ পারচেজ ইত্যাদি) বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত লিমিটের মধ্যে (প্রতি ট্রানজাকশনে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা ইত্যাদি) কালেকটিং এজেন্ট হিসেব মোবাইল ব্যালেন্স ব্যবহার করে ডিরেক্ট অপারেটর বিলিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ নির্দেশনার আলোকে বিটিআরসির অনুমতি নিয়েই ফরচুমো গ্রামীণফোনের মাধ্যমে এ সেবা প্রদান করছে।

ফরচুমো বিশ্বব্যাপী এগ্রিগেটর হিসেবে মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানি ও কনটেন্ট কোম্পানিদের এ সেবা দেয়। স্পটিফাইয়ের পাশাপাশি গুগল, অ্যামাজন, টেনসেন্ট -এর মতো ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো ফরচুমোর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩০০ এর বেশি মোবাইল অপারেটরে ডিরেক্ট অপারেটর বিলিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের মোবাইল ব্যালেন্স ব্যবহার করে তাদের সার্ভিসের পেমেন্ট সংগ্রহ করার সেবা নেয়। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারী প্রকৃত সেবা (স্পটিফাই প্রিমিয়াম) কেনার সময় সেবা প্রদানকারী স্পটিফাইয়ের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে তার পেমেন্ট অপশন পছন্দ করতে পারেন এবং ক্রেডিট কার্ডের মতো ওটিপি দিয়ে সম্মতি ভেরিফিকেশন করার পরেই কেবল মোবাইল ব্যালেন্স থেকে টাকা কাটা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রাহক সার্ভিস নেয় মোবাইলফোন কোম্পানির কাছ থেকে। ফলে গ্রাহক কোনও সেবা নিয়ে ব্যবহার করতে না পারলে বা প্রতারিত হলে গ্রাহক অভিযোগ করবে অপারেটরের বিরুদ্ধে। অপারেটর তার সেবা নিজে দিচ্ছে না থার্ড পার্টির মাধ্যমে দিচ্ছে এটা গ্রাহক দেখবে না। ফলে যেকোনও সেবার বিষয়ে মোবাইল ফোন কোম্পানি দায় এড়াতে পারে না।

ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভাস সেবা নিয়ে সমস্যা হওয়ায় বর্তমানে গ্রাহকের মোবাইলে ভাস (টি-ভাস বা টেলিকম ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস) সার্ভিস নিতে হলে অবশ্যই ক্রেতার অনুমতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) চালু করা হয়েছে। ফলে এখন কোনও সেবা গ্রহীতার (মোবাইল ব্যবহারকারী) মোবাইল থেকে এখন টি-ভাসের নামে টাকা কেটে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন, আগে ভাস সেবা নিয়ে অনেক অনিয়ম হয়েছে। কমিশনে প্রচুর অভিযোগও পড়েছে। কমিশন সেসব তদন্ত করে অনিয়ম পেয়ে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বিটিআরসি একটি নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসারে। ডাইরেক্ট অপারেটরস বিলিং ডিরেক্টিভসে বিলিং অপারেটরদের সীমিত কিছু কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনায় কনটেন্ট, অ্যাপস, ভাসের বিল পরিশোধের কথা বলা হয়। দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো ওই নির্দেশনা মেনে বিলিং অপারেটরদের সহযোগিতা নিয়ে থাকে বলে জানা গেছে। ডা. আব্দুন নূর তুষার আরেকটি যে সেবার বিষয়ে অভিযোগ তুলেছেন সেই ফরচুমো কোম্পানির সঙ্গে গ্রামীণফোন ওই নির্দেশনার আলোকে ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে সেবাদান কার্যক্রম শুরু করে।

প্রসঙ্গত, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি দেশের ১৮৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘টি-ভাস’ লাইসেন্স দিয়েছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে টি-ভাস রেগুলেটরি গাইডলাইন মেনে স্বচ্ছতা, ন্যায় ও বৈষম্যহীন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নীতিমালার যথাযথ বিবেচনায় সাধারণ জনগণকে নিরাপদ, উপযোগীমূলক, দক্ষ সর্বজনীন ও সাধ্য অনুযায়ী টি-ভাস সেবা দিতে বলা হয়েছে। এই নিয়মের ব্যত্যয় করায় তথা গ্রাহকের অজান্তে মোবাইল থেকে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগে ১১টি-ভাস কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। এর সঙ্গে দুটি মোবাইল ফোন অপারেটরের জড়িত থাকার প্রমাণও পায় কমিশন।

জানা যায়, দেশের বাইরের কোনও প্রতিষ্ঠান এ দেশে ভাস সেবা দিতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা ছাড়পত্র নিতে হয়। কারণ দেশ থেকে টাকা নিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন থাকতে হয়। বেশ কয়েক বছর আগে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান হাঙ্গামা এ দেশে ভাস সেবা দিয়ে পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে কয়েকগুণ অর্থ লাভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহ হলে ব্যাংকটি বিটিআরসির কাছে হাঙ্গামা সম্পর্কে তথ্য চেয়ে পাঠায়। সেসময় নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাঙ্গামার এ দেশে কাজ করার অনুমোদন ছিল। অনুমোদন ছিল বাংলোদেশ ব্যাংকেরও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেক ভাস সেবার অ্যাপ রয়েছে। মোবাইলফোন ব্যবহারকারীরা সেই অ্যাপ ডাউনলোড করে ব্যবহাররের সময় নিয়মকানুন ঠিক মতো পড়ে দেখেন না। ইয়েস বা নেক্সট বা এগ্রিতে ক্লিক করে চলে যান। যখন কোনও সমস্যা হয় তখন তিনি আমাদের বলেন, তার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি বা তার অজান্তে টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। আসলে তিনি আগেই কোনও কিছু না পড়ে অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। ফলে গ্রাহককে যেকোনও মোবাইল কেন্দ্রিক সেবা নেওয়ার আগে জেনে বুঝে তবেই নেওয়া উচিত বা সম্মতি দেওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + 2 =