কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে জোর দিতে হবে

অথর
জে এন এস নিউজ ডেক্স :   কুষ্টিয়া
প্রকাশিত :১৭ অক্টোবর ২০২১, ৪:২৮ অপরাহ্ণ | পঠিত : 41 বার
কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে জোর দিতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের ভিত্তি অবশ্যই কৃষি। এর তিন চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকে উপেক্ষা করে তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। কৃষি উন্নয়নে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রসরতার তাগিদে আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের সুযোগ নিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে যথার্থ আত্মনিবেদন, প্রবল জনবিস্ফোরণ ও ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যার সুরাহা। এমতাবস্থায় কৃষিক্ষেত্রে চাপ বাড়া খুবই স্বাভাবিক। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা কৃষির মান উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষিজাত উৎপাদনের পরিমাণও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তিবিদ্যায় সফলতা ও সুফলকে কাজে লাগিয়ে দেশের অনেক শিক্ষিত বেকার আজ স্বাবলম্বী, প্রতিষ্ঠিত ও সফল।

অনেক শিক্ষিত যুবক-যুবতী সরকারি চাকরির পিছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তারা অনেকেই ভুলে যায়, শিক্ষা শুধু চাকরির ভিত নয়, শিক্ষা জীবনের আলো। শিক্ষিত সমাজ ভুলে যায় সীমিত সরকারি ব্যবস্থায় অজস্র চাকুরি প্রদান অসম্ভব। অজস্র চাকরিপ্রার্থীর ভিড়ে তাই সরকার দিশেহারা এবং সরকারি আমলাদের অনেকেই প্রার্থীদের প্রতিযোগিতার সুযোগে দুর্নীতি করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিযোগিতার সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতি বাড়ছে, সমাজ অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে এবং আমরাও ক্লান্তিতে ভুগছি।

এ অবক্ষয়ের যুগেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি কিন্তু কার্যকর ও উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা নিয়েই চলছে। তথাকথিত শিক্ষিতদের বাদ দিলেও গ্রামীণ মানুষের যথার্থ যোগদান প্রতিক‚ল অবস্থাতেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় সাড়া জাগানো ভ‚মিকা নিয়ে চলেছে। গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকরা অনেকাংশেই কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। তারা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের প্রয়াস অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। কৃষিক্ষেত্রে তাদের আরও অবাধ যোগদান দেশকে অবশ্যই ভবিষ্যতে এক উন্নত দেশের মর্যাদা দিতে পারে। কারণ কৃষিকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের উন্নতি অসম্ভব।

এখন দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও জনসংখ্যার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। দেখা যায়, গ্রামে-গঞ্জে জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি এবং কৃষিক্ষেত্রে তার প্রভাব যথেষ্ট। বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কৃষিতেও উন্নয়ন জরুরি। বিভিন্ন সমস্যা ব্যর্থ রাজনীতি, সরকারি ভ্রান্তনীতি, জনবিস্ফোরণ ইত্যাদি আমাদের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে, যার সিংহভাগই প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে কৃষিজীবীর বিপক্ষে। প্রতিক‚ল পরিবেশের মোকাবিলা করে কৃষিতে আঁকড়ে থাকাই কিন্তু আমাদের প্রধান ভরসা। সুতরাং, কৃষিক্ষেত্রে অবাধ যোগদান নিশ্চয়ই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অগ্রণী ভ‚মিকা নিতে পারে।

ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার জীবনমানের দিকে তাকানোর ফুরসৎ আপাতত আমাদের নেই। আমাদের উন্নয়নের পটভ‚মি কৃষিভিত্তিকই তৈরি করতে হবে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ কৃষিজীবী, অন্যদিকে আমাদের দেশের ৭০ শতাংশই কৃষিজীবী। আকাশ-পাতাল তফাৎ। এ ধ্রæবসত্যকে উপেক্ষা করা যায় না। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিচার ধারা এক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ববহ। পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের এখন মাঠে নামতে হবে এবং সরকারি অনুদানকৃত সমস্ত সুযোগসুবিধা দেশের অর্থনৈতিক উদ্ধারে নিবেদিত হতে হবে। কৃষিক্ষেত্র থেকে মুখ না ফিরিয়ে নিজ অধিকার বলে হরির লুটকে নিয়ন্ত্রণ করে স্ব-নির্ভর হতে হবে। কৃষির উন্নতিতেই গ্রামীণ স্ব-নির্ভরতা এবং গ্রামীণ স্ব-নির্ভরতাতেই বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশ। বিভিন্ন পরিকল্পনায় কৃষির উন্নয়নে সরকারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া উচিত। কোথায়, কী বাবদ, কত টাকা মঞ্জুর হচ্ছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে শিক্ষিত সমাজকে তার খতিয়ান রাখতে হবে এবং নিঃস্বার্থ সেবায় পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি গ্রামে । এক্ষেত্রে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভ‚মিকা অপরিসীম। সংবাদ মাধ্যমে তৎপরতার সঙ্গে যেন রাজনৈতিক নেতাদের কেচ্ছাকাহিনীর পাশাপাশি সরকারি সমস্ত ব্যবস্থার স্বচ্ছ তালিকা সর্বদা যথাযথ ও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়, সে ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে লক্ষ লক্ষ অর্ধাহারী, অনাহারীর মৌলিক চাহিদার দিকে প্রথম তাকানোর আবশ্যকতা রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি নিতান্ত পিছিয়ে নেই। দেশের অর্থনীতি এবং আপাতশান্তির বাতাবরণ গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থানের উপরই টিকে রয়েছে। প্রয়োজন আরও গতি সঞ্চারের। প্রবল জনবিস্ফোরণ এবং পরিকল্পিত শিক্ষাপদ্ধতি, দুর্নীতি এবং ভ্রষ্টাচারের সুযোগে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাই আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। অপরিকল্পিত শিক্ষা পদ্ধতির ফলে ছাত্রছাত্রীরা কলেজে উঠেই রঙ্গ-বেরঙ্গের জালে জড়িয়ে দিশাহীন হয়ে যায়। কৃষি এবং কৃষি সম্বন্ধীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আধুনিকতার পরশে চিরাচরিত দেশীয় জীবনযাত্রার মৌলিকতা সুরক্ষিত রেখেও নতুন দিশার সূচনা করতে পারে। হস্তশিল্প, বয়ন শিল্প, খাদি ও গ্রামোদ্যোগের প্রভাব আমাদের উন্নতি ঘটাতে পারে। এছাড়া মৎস্য চাষ, ফুল চাষ, পাট চাষ, পান চাষ, পশুপালন, দুগ্ধ প্রকল্প, ইক্ষু চাষ এবং তদসঙ্গে চা-শিল্প ও কাগজ শিল্প আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আরও অবাধ যোগদান এবং পরিকল্পিত অবস্থান শিক্ষিত যুবক-যুবতীকে শিক্ষার আলোয় নিঃসন্দেহে স্বনির্ভরতা আমাদের উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে। শিক্ষা পদ্ধতিকে সে ধরনের কর্মমুখী করার উদ্দেশ্য নিয়ে সংস্কার করতে হবে।

পাহাড়ি জনজাতির জুম চাষ আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এসব ক্ষেত্রে তাদেরও উন্নত চিন্তাধারা এবং সহযোগিতার প্রয়োজন। বনজ স¤পদের অবাধ ধ্বংস রোধ করে জুম চাষির চাষ ক্ষেত্রকে উন্নত প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা ও অনুদানের প্রয়োজন এবং সেটি সুনিশ্চিত করতে হবে। উপযুক্ত শৈক্ষিক পরিবেশ ও পরিকাঠামোতে আমাদের অর্থনীতি অবশ্যই দিশা পাবে। এক্ষেত্রে উপযুক্ত বাজার ও পথঘাটের যথেষ্ট ভ‚মিকা রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান চিরন্তন। যাযাবর জীবনের অবসানে কৃষি সভ্যতার গোড়াপত্তনেও নারীর অবদান সর্বজন সস্বীকৃত। আমরা বাংলাদেশি নারীকে ঘরের লক্ষ্মী বলে জানি। বাস্তবে নারী দূরদর্শী ও অধ্যবসায়ী। আদর্শ সমাজ গঠনের অগ্রদূত। কৃষি সভ্যতার এ দেশে গ্রামীণ মহিলারা পুরুষের কর্মক্ষেত্রের নিত্য অনুসঙ্গী। পশুপালন থেকে আরম্ভ করে চাষাবাদ এবং দ্রব্যের বাজারীকরণ সর্বত্রই নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান গ্রামীণ জনজীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এককথায়, গ্রামীণ অর্থনীতিনির্ভর দেশীয় অর্থনীতিতে এবং সমাজ জীবনে নারীর অবদান ও ভ‚মিকা অপরিমেয়। যে জাতির নারীরা যত উন্নত মানসিকতায় সমুন্নত, সে জাতির অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ভারসাম্য ততবেশি সুরক্ষিত।

আমাদের কৃষিক্ষেত্রে অনেক শিক্ষিত মহিলা ও যুবতীদের প্রত্যক্ষ অবদান চোখে পড়ার মতো। তারাই মাঠে বর্ষাকালীন শস্য থেকে রবিশস্য উৎপাদনের সময় পর্যন্ত নিরলস সহায়তা করে যান। গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সিংহভাগই মহিলাকেন্দ্রিক ও মহিলা নির্ভর। তবে অর্থনৈতিক সংস্কারকদের একটি ব্যাপারে সচেতন হতে হবে- কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও যোগদান আনুপাতিক হারে সর্বাধিক হলেও মধ্যবিত্ত ও তদূর্ধ্ব স্তরের মহিলারা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের যোগদানের সুযোগ থাকলেও তাদের সিংহভাগই কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিযুক্ত নন। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মহিলাদের শ্রমবিমুখতাও দেখা যায়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে মেয়েদের অবাধ ও নির্ভয়ে যোগদান আমাদের অর্থনীতিকে শুধুই চাঙ্গা করবে না, বরং এক মজবুত আর্থসামাজিক পরিবেশের সূচনাও ঘটাবে। ফলে নারীরা শুধু বোঝা হবে না, বরং সমাজের এ অর্ধাংশের যোগদানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং সুস্থ সমাজ গঠন সুনিশ্চিত করবে। এক কথায়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মহিলাদের যোগদান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত করবে। এটা নারীর স^নির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতিষ্ঠাকে সুনিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে উপজাতি মহিলা, চা-শ্রমিক মহিলা, মণিপুরি- জনগোষ্ঠীর মহিলারা উদাহরণ হয়ে আমাদের আদর্শ প্রেরণা হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 6 =